উষ্ণায়ন বৃদ্ধির প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর চাহিদা বাড়তে দেখা গেছে। গ্রিন বা পরিবেশবান্ধব অফিস নির্মাণে এগিয়ে এসেছে একের পর এক করপোরেট প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চলতি বছর আকস্মিকভাবেই গ্রিন অফিস নির্মাণে স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানকে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের ওপর পরিচালিত এক বৈশ্বিক জরিপে উঠে এসেছে, বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব অফিস ভবনের নির্মাণ চাহিদা হঠাৎ করেই স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশবান্ধব অফিস নির্মাণের চাহিদা এখন নিম্নমুখী। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
জরিপটি করেছে লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইনস্টিটিউশন অব চার্টার্ড সার্ভেয়ারস (আরআইসিএস)। বিশ্বব্যাপী ভবন নির্মাণ ও রিয়েল এস্টেট খাতের পেশাজীবীদের মধ্যে চাহিদা, টেকসই ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে সচেতনতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে জরিপটি করা হয়। জরিপে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার ভবন ব্যবহারকারী ও এ খাতে বিনিয়োগকারীরা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে এ দুই মহাদেশে পরিবেশবান্ধব শর্ত পূরণের চেষ্টা এখন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে এসেছে।
বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে পরিবেশবান্ধব অফিসের চাহিদা চলতি বছর ব্যাপক মাত্রায় কমে এসেছে। যদিও সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি জায়ান্ট বৈশ্বিক বহুজাতিকগুলোর বড় একটি অংশের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্থিত। বিশ্বের বাকি অংশে এ ধরনের ভবন নির্মাণের চাহিদা এখন কিছুটা বাড়লেও এর হার তুলনামূলক ধীর।
ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের সম্মিলিত হিস্যা ছিল ৩৪ শতাংশ। এ খাতে নিঃসৃত অধিকাংশ কার্বনের উৎস হলো ভবনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার সরঞ্জাম ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি। করপোরেট ভবনগুলোর মোট কার্বন নিঃসরণের ২০ শতাংশে ভূমিকা রাখে এগুলোর নির্মাণ কৌশল।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু লক্ষ্য পূরণের জন্য ভবন নির্মাণ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর অবস্থা নেয়া অত্যাবশ্যক বলে মনে করছে জাতিসংঘ। যদিও গোটা বিশ্বেই পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের চাহিদা এখন সার্বিকভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে।
পরিবেশের ওপর ভবন নির্মাণের নেতিবাচক প্রভাব কমাতেই ‘গ্রিন অফিসের’ ধারণাটি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের স্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের টেকসই প্রযুক্তি ও নির্মাণ কৌশল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন বেশি কার্বন নিঃসরণকারী কংক্রিটের ব্যবহার কমানো, পানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতা, তাপ শোষণকারী জানালার ব্যবহার কমানো এবং নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি। এছাড়া জ্বালানির উৎস হিসেবে উন্নততর পদ্ধতির ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির পরিচালন ব্যয় কমাতে সাহায্য করে।
আরআইসিএসের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস ম্যাকলিন বলেছেন, ‘বর্তমানে আমরা যা দেখছি তা হয়তো সাময়িক। যারা এ ভবনগুলো ব্যবহার করবেন তারা চাইবেন, সেগুলো টেকসই হোক। সবাই জানে এটিই সঠিক কাজ।’
তিনি জানান, বড় করপোরেটগুলোর কাছে পরিবেশবান্ধব অফিসের চাহিদা বেশি। কারণ এ ধরনের ভবন সাধারণত প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়ে থাকে। এতে ভাড়া বাবদ ভবন মালিকদের আয়ও হয় তুলনামূলক বেশি।
জরিপে অংশ নেয়া মার্কিন নির্মাণ খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্যিক ভবন ব্যবহারকারীদের ক্ষুদ্র একটি অংশের মধ্যে এখন পরিবেশবান্ধব অফিসের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। আগের জরিপে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় পরিবেশবান্ধব ভবনের চাহিদা বাড়ার কথা জানিয়েছিলেন অংশগ্রহণকারীদের ২৫ শতাংশ। এবার সে হার নেমে এসেছে ১১ শতাংশে।
এদিকে আমেরিকা অঞ্চল বাদ দিয়ে ইউরোপ ও এশিয়াসহ বিশ্বের বাকি অংশে পরিবেশবান্ধব অফিস ভবনের চাহিদা কিছুটা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সর্বশেষ জরিপে এমন মন্তব্য করেছেন ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা। তবে ২০২১ সালে প্রথম জরিপের সময় ৪৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী এমন তথ্য দিয়েছিলেন।
আরআইসিএসের টেকসইবিষয়ক বিশ্লেষক কিসা জেহরা বলেন, ‘সরকারি নীতি ও নিয়মাবলি বাজার আস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।’
এর কারণ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করেন কিসা জেহরা। তিনি জানান, জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ডেমোক্র্যাট প্রশাসন পরিবেশ সংরক্ষণ নীতির ওপর বিশেষ জোর দেয়। তখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছিল অগ্রাধিকারের বিষয়। ওই সময় বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) ক্রেতাদের জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা চালু হলেও তা গত সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন বাড়ানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভবন নির্মাণে যুক্ত সংস্থাগুলো এখন প্রকল্পের এম্বেডেড কার্বন পরিমাপ করাও কমিয়েছে। এম্বেডেড কার্বন হলো ভবনের নির্মাণ উপাদান তৈরি ও ব্যবহারের সময় নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড। এ প্রক্রিয়ায় ইস্পাত, কাচ ও কংক্রিট তৈরিতে অথবা নির্মাণ প্রক্রিয়ায় নিঃসৃত কার্বনকেও হিসাবে নেয়া হয়। জরিপে নির্মাণ খাতের পেশাজীবীদের ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে এম্বেডেড কার্বনের মাত্রা পরিমাপ করছেন না। আগের বছরের জরিপে একই উত্তর দিয়েছেন ৩৪ শতাংশ।